নিউরসাইন্সের দুনিয়াইঃ ‘ট্রিপেনেশান থেকে স্ক্রিজফ্রেনিয়া’

Feature Image

অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম নিউরসাইন্স নিয়ে যা যা প্রতিদিন পড়ব তার একটা ধারবাহিক সিরিজ লিখব গল্প আকারে। নিজের আলসামি আর সময়ের অভাবে হয়ে উঠছিলোনা। তবে আজ ফাইনালি মনে হচ্ছে কাজটা শুরু করার সাহস পেলাম। এটা সেই ধারাবাহিক গল্পের প্রথম পর্ব।

আমার মতে কোন বিষয় নিয়ে গভীর স্টাডির পূর্বে তার ইতিহাস নিয়ে জানাটা খুব জরুরি, কেননা ইতিহাস কোন বিষয়ের একদম ভিতরে প্রবেশ করতে সবচেয়ে ভালো অনুপ্রেরনা জোগায়। তাই আজকের গল্প হবে নিউরসাইন্স এর ইতিহাস নিয়ে। নিউরসাইন্সের ইতিহাস অনেক বিস্তর হবার কারনে আমি এটাকে মোট তিন পর্বে লিখবো বলে চিন্তা করেছি।

প্রথম পর্ব (7000 B.C to 1037 A.D.)

আজকের গল্পে থাকবে সাত হাজার বছর পূর্বে মানুষ কিভাবে পৃথিবীর প্রথম ব্রেইন অপারেশানের পদ্ধতি আবিস্কার করে ফেলে যা পরবর্তিতে উনবিংশ শতাব্দিতে আবার পুনঃআবিস্কার হয় আমেরিকান এক বিখ্যাত পলিম্যাথ এর মাধ্যমে। থাকবে ইউরোপে যখন বিজ্ঞানের অন্ধকার যুগ চলছিলো তখন নিউরসাইন্সের মতো দুর্বোধ্য একটা ফিল্ডে কিভাবে মুসলিম বিজ্ঞানিরা একের পর এক অসামান্য অবদান রেখে যাচ্ছিলো। So, No more Introduction. Let’s start, Shall we!

Trepanation: A weird system of Brain Surgery (7000 B.C)

আজ থেকে সাত হাজার বছর পূর্বের কথা, নিউলিথিক যুগের মানুষেরা একধরনের অপারেশান পদ্ধতির আবিস্কার করে যার নাম “TREPANATION” । এটা এমন এক পদ্ধতি যার মাধ্যমে মাথার স্কাল বর্গাকার অথবা গোলাকার ভাবে কাটা হতো এবং ছোট খাটো একটা হোল তৈরি করা হতো। এটা করা হতো ব্রেইন এর “Obelion” (Above the superior sagital sinus, where blood from the brain collect before flowing into the brain’s main outgoing veins) নামক পজিশান এর ঠিক নিচে। সাধারনত কারো কোন মানসিক সমস্যার তিব্রতা বেশি দেখা দিলো তারা এ কাজ টা করতো।

এ ব্যাপারে তাদের ফিলোসফি ছিলো খানিকটা এরকম, মানসিক সমস্যাকে তারা আদর করে বলতো ‘Sacred Disease’ (Mainly Epilepsy)। যা হয় ‘Evil Spirit’ এর কারনে, এবং Trepanation পদ্ধতি ব্যবহার করলে রোগির Evil Spirit মাথা থেকে বের হয়ে যায়, ফলে সেই মানসিক সমস্যা থেকে রোগি দ্রুত মুক্তি লাভ করতে পারে

Trepanation System

বহুবছর গত হয়ে গেলো। সময়টা ১৮৬০ সাল, আমেরিকান এক Polymath E.G. Squire, সন্ধান পেলো এক অদ্ভুত মহিলার। মহিলার বাসা পেরু, যে শখের বসে মানুষের মাথার খুলি সংগ্রহ করতো তার নিজস্ব যাদুঘরের জন্য । তার সংগ্রহের মধ্যে কিছু খুলির মাঝখানে বিভিন্ন আকারের গর্ত দেখা গেলো, যার সাথে নিউলিথিক যুগের ট্রিপেনেশান এর মিল পাওয়া যাচ্ছিলো। এই ভিন্নতা বিজ্ঞানি Squire এর দৃষ্টি আকর্ষন করলো এবং তিনি কিছু স্যাম্পল সেখান থেকে নিয়ে নিউয়র্ক জাদুঘরে উপস্থাপন করলেন। সেই সেমিনারে সেসময়ের বিখ্যাত ফ্রেনলজিষ্ট Paul Broca এ বিষয়ে জানতে পারলেন। তিনি মাথার খুলি গুলো নিয়ে তার অনুসন্ধ্যান এ নামলেন এবং গবেষনা শেষে বললেনঃ

“Trepanation পদ্ধতি পৃথিবীতে বহু বছর ধরে প্রচলিত। ইউরোপ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন যায়গাই এটার প্রচলন ছিলো। এমনকি বিখ্যাত মেডিসিন বিজ্ঞানি Hippocrates এর সময়কালে Tumi, flin & Obsedian নামক যন্ত্রের আবিস্কার হয় এই সার্জারি পদ্ধতি টা সফল ভাবে সম্পন্ন করার জন্য। তবে সার্ভাইভাল রেট অনেক কম হওয়াই (১০- ২০%) আস্তে আস্তে Trepanation পদ্ধতির বিলিন হয়ে যায়

Paul Broca

এছাড়া জানা যায়, Trepanation পদ্ধতি সম্পন্ন হওয়ার এক সপ্তাহ থেকে ত্রিশ দিনের মধ্যেই অধিকাংশ রোগি মারা যেতো । গবেষণাই আরো দেখা যায়, Trepanation এর পর পরই ইনফেকশান দেখা দিতো অধিকাংশ রোগির মস্তিস্কে, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা মারা যেতো Brain Hemorrhages, Meningitis, Stroke নামক জটিল ক্রিয়াই ।

Hole of Trepanation

বহু বছর পর ২০১১ সালে এরকম ফসিল আবার একবার পাওয়া যায়, রাশিয়ার ‘Rostov-on-Don‘ নামক শহরে। এটা সোভিয়েত থেকে ভাগ হয়ে যাওয়া দেশ জর্জিয়ার মধ্যে পড়ে। সেখানে এক আর্কিওলজিকাল স্টাডি করতে গিয়ে বিজ্ঞানিরা এক কবরস্থানে ১৩৭ টা মাথার খুলির দেখা পাই। যার মধ্যে ৯ টা খুলিতে Trepanation টাইপের হোল পাওয়া যায়। ধারনা করা হয় এসব মাথার খুলি ‘Copper Age’ এর সময়কার হবে, যারা Ritual Trepanation এ বিশ্বাসি ছিলো।

What is the Centre of Intellect: Heart or Brain? Evergreen conflicts between Aristotle (384-322 B.C) and Hippocrates (460-379 B.C.).

একসময় পৃথিবীতে এরকম ধারনা প্রচলিত ছিলো যে, Aristotle & Plato যা জানে না তা নিয়ে মাথা ঘামানোটাও সাধারণ মানুষের অপরাধ এবং স্বভাবতই নিউরসাইন্স এর সবচেয়ে প্রাথমিক তর্ক, Heart vs Brain, নিয়ে তাদের অভিমত ছিলো জোরালো। তাদের কথা ছিলো স্রেফঃ

Heart is the centre of intelligence, not the brain

Aristotle

তাদের এ ধারনা যদিও পরে ভুল প্রমানিত হয় বিজ্ঞানি Hippocrates এর থিওরির মাধ্যমে। Hippocrates এর মতেঃ

Brain involves not only in intellect but also in our sensation

Hippocrates
Hippocrates- Founder of Modern Medicine

জানিয়ে রাখি Medical Science অসামান্য অবদানের কারনে Hippocrates কে মর্ডান মেডিসিন এর প্রতিষ্ঠাতা বলা হই। তার বিখ্যাত বই ‘On the Sacred Disease’ এর মাধ্যমে বহুল আলোচিত হার্ট বনাম ব্রেইন যুক্তিতর্কের অবসান ঘটে, এবং সবাই মেনে নেই যে মানুষের বুদ্ধিমত্তার আসল উৎস আসলে ব্রেইন, হার্ট নই।

Alexandrian Neuroscience: Cerebrum, Cerebellum and Hirophilos

বিখ্যাত আলেক্সেন্ডার দ্য গ্রেট- The King of the kings, এর সময়কালে অ্যানাটমি আর ফিজিওলজ়ি নিয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান চর্চা হতো। এই জ্ঞান চর্চাই নেতৃত্ব দিতেন Hirophilos নামক এক বিজ্ঞানি, যাকে মেডিক্যাল সাইন্সে ‘Anatomy’ এর Pioneer হিসাবে গন্য করা হয়। Hirophilos নামের এই ভদ্রলোকের নিউরসাইন্সে অবদান ও কম ছিলোনা। তিনিই প্রথম ব্রেইনের সেরেব্রাম এবং সেরেবেলাম নামক যে দুটি পৃথক পৃথক অংশ আছে তার বর্ণনা দেন। তিনি মস্তিস্কের সাইনাস এবং মস্তিস্কের সূক্ষ্ম পর্দা মেনিঞ্জেস এর ও সর্বপ্রথম ধারনা দেন।

Galen: First recognized Neuroscientist in History (129-199 A.D.)

গ্যালেন কে আজ অব্দি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নিউরসাইন্স বিজ্ঞানিদের মধ্য একজন হিসাবে গন্য করা হয় । গ্যালেন সেরেব্রাম কে ‘Soft & in the Front’ এবং সেরেবেলাম কে ‘Hard & in the Back’ বলে বর্ণান দেয়েছিলেন। আমাদের Sensation and Perception এর জন্য যে মস্তিস্কের সেরেব্রাম এবং Movement Control এর জন্য যে মস্তিস্কের সেরেবেলাম দায়ি তার সরল বর্ণানা তিনিই দেন। তিনি ভ্যাড়ার ব্রেইন এবং এর অ্যানাটমি নিয়ে গবেষণা করতেন। এই গবেষনা করতে গিয়ে একসময় তিনি মস্তিস্কের ভেন্ট্রিকল নামক গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবিস্কার করে ফেললেন। গ্যালেন এর পর নিউরসাইন্সের অগ্রগতি পৃথিবী জুড়ে থেমে যাই বহু বছরের জন্য। সেকারনে গ্যালেন এর মৃত্যুর পর ও ১৫০০ বছর ধরে তার থিওরি গুলো পৃথিবীতে একচেটিয়া আধিপত্য চালিয়ে যায়।

Ventricles of Brain- Discovered by Galen

Muslim Scientists in the field of Neuroscience

Ahmed Ibn Sahl Al- Balkhi (850-934 A.D.)

Galen এর আবিস্কারের পর ৫০০-৭০০ বছর নিউরসাইন্সের দুনিয়া নিঃশব্দে পার হয়ে যাই। ইউরোপে তখন জ্ঞান বিজ্ঞানের দুর্ভিক্ষ চলতেছে, আর অন্যদিকে মুসলিমরা একের পর এক অবদান রেখে যাচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমস্ত শাখা জুড়ে। ধারনা করা হয় ৭০৫ খ্রিষ্ট্রাব্দের দিকে পৃথিবীর প্রথম এবং সর্ববৃহৎ মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় বাগদাদ শহরে।

নবম শতাব্দির শেষের দিকের কথা, Ahmed Ibn Sahl Al- Balkhi নামক এক মুসলিম বিজ্ঞানি তার বই ‘Sustenance for Body and Soul’ এ প্রথম Mind, Body and Soul (Nafs) শব্দগুলো নিয়ে ধারনা দেন। তিনিই প্রথম Body and Mind এর মধ্যকার বিভিন্ন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনিই এখনকার দুনিয়ার সবচেয়ে আলোচিত সমস্যা Depression নামক অনুভূতিটাকে রিকগ্নাইজ করেন। তার মতেঃ

‘If nafs get sick, the body may also find no joy in life with the development of physical illness’

Ahmed Ibn Sahl Al- Balkhi

Muhammad Ibn Zakaria Al Razi, Ibn Al Haytham and Al Biruni

  • Zakaria Al Razi তার বিখ্যাত দুটি বই ‘El Mansuri’ এবং ‘El Hawa’ তে সর্বপ্রথম মানসিক বিভিন্ন সমস্যার Symptoms এবং বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা দেন।
  • Ibn Al Haytham কে Experimental Psychology বিভাগের জনক বলা হয়। পৃথিবীতে যখন দৃষ্টির (Vision) উৎপত্তিস্থল নিয়ে কেউ কোন ধারনা দিতে পারতেছিলোনা, হাইথাম তখন তার বই ‘Book of Optics’ এ vision এর সঠিক বর্ননা দিয়ে বলেন, ‘Vision Mechanism occur in the inside portion in our brain, not in our eye’. যা পরবর্তীতে Scientist Descartes বর্ণনা করেন পুরোপুরি।
  • Al Biruni~ ‘Reaction Time’ নিয়ে প্রথম ধারনা দেন। Reaction time নিয়ে যাদের ধারনা নেই তাদের বলে রাখি, [Reaction time is the amount of time it takes to respond to a stimulus. An example of reaction time is when a bug stings within 1 second of being approached]। Reaction Time নিয়ে Al Biruni বলেনঃ

“Not only is every sensation attended by a corresponding change localized in the sense-organ,which demands a certain time, but also, between the stimulation of the organ and consciousness of the perception an interval of time must elapse, corresponding to the transmission of stimulus for some distance along the nerves.”

Al Biruni

Ibn Sina (Avicenna): The greatest of them all (980-1037 A.D.)

ইবনে সিনা তার ৫৭ বছরের জীবনে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রেত্যেক টা শাখাই যতটা অবদান রেখে গেছেন, পৃথিবীর আর কেউই হইতো তা পারেনি। তার ‘Qanun Fit-Tib’ নামক বইটা মেডিক্যাল সাইন্সের ইন্সাইক্লপিডিয়া হিসাবে ব্যবহৃত হয় বহু বছর। জ্ঞানের সব শাখার মতো নিউরসাইন্সে ও তার অবদান ছিলো অনেক।

তিনি Insomnia, Mania, Hallucination, Dream, Nightmare, Dementia, Epilepsy, Stroke, Paralysis, Melancholia, Feelings of Love এরকম অনেক টার্ম গুলোর প্রথম সঠিক বর্ণানা করেন। ইবনে সিনাই Madness কে সর্বপ্রথম Majnun হিসাবে আখ্যা দেন, এবং বলেনঃ

‘Majnun is a mental Disorder which comes from the dysfunction of the middle portion of Human Brain’

Ibn Sina
Ibn Sina- The Greatest Muslim Scientist of all time

ইবনে সিনা প্যারালাইসিস, হাইপারমিয়া আর মেনিঞ্জাইটিস নিয়ে গবেষনা করতে গিয়ে মস্তিস্কের Vermis and Caudate Nucleus নামক দুটি অবস্থান কে আবিস্কার করেন, যা আজও একি নামে পৃথিবীব্যাপি সমাদৃত। ইবনে সিনা Schizophrenia কে সর্বপ্রথম Janun Mufrit নামে অভিহিত করেন। তিনি Schizophrenia / Janun Mufrit নিয়ে বলেনঃ

Janun Mufrit or schizophrenia is one type of severe madness with characteristic symptoms such as agitation, behavioral and sleep disturbance, giving inappropriate answers to questions and occasional inability to speak. And These patients must be restrained in order to avoid any harm they might cause to themselves or to others’

Ibn Sina about Schizophrenia

প্রথম পর্বের লেখা শেষ করবো মজার এক কাহিনী দিয়ে। ইবনে সিনা মানুষের পালস রেট পরিক্ষা করে Love Sickness or Ishq কে প্রথম Diagnosis করতে সক্ষম হন । কিভাবে তিনি এটা করতেন? চলুন একটা বিষয় ইমাজিন করি। ধরুন একটা ছেলে একটা মেয়ের প্রতি Love sickness রোগে ভুগতেছে মানে প্রেমে পড়ছে, কিন্তু বুঝতে পারতেছেনা তার কেনো এমন ফিলিংস হচ্ছে। ইবনে সিনা এই অবস্থাই ঐ ছেলের নরমাল পালস রেট একাবার চেক করতেন। তারপর ছেলেটার কানে পার্টিকুলার ঐ মেয়ের নাম, গ্রাম, শহর উচ্চস্বরে বলতেন। তিনি লক্ষ করতেন ছেলেটার পালস রেটে নাম গুলো বলার সাথে সাথে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যা নরমাল পালস রেটের চেয়ে আলদা। তিনি Love Sickness বিষয়টাকে Detection করতেন এরকম এক ম্যাজিকাল পদ্ধতিতে, যা সেকালে এক বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিলো।


If you want to read my other articles related to Neuroscience. Click below:

3 thoughts on “নিউরসাইন্সের দুনিয়াইঃ ‘ট্রিপেনেশান থেকে স্ক্রিজফ্রেনিয়া’”

  1. BC or AD should be added after every date for clear understand.

    & instead of “দেখা যাই ” ” থেমে যাই’ ….for third person ‘দেখা যায় ” is correct . য় for third person . For first person it is যাই.

    Writting quality is good. Interesting.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *